‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্যই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ছয় দফা দাবির আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল।'
পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক, সামাজিক শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে অগ্রসর ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন-শোষণ প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ব পাকিস্তান দ্রুত পিছিয়ে যেতে থাকে। বৃদ্ধি পেতে থাকে দুই অঞ্চলের মধ্যকার বৈষম্য। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব বাংলার চাইতে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। যেমন ১৯৫৫-৫৬ সাল থেকে ১৯৫৯-৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তান লাভ করেছিল ১১৩ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান তখন পেয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। একই ভাবে ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৪-৬৫ সাল পূর্ব পাকিস্তান লাভ করে ৬,৪৮০ মিলিয়ন টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ছিল ২২,২৩০ মিলিয়ন টাকা। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, কৃষিসহ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে পূর্ব পকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের চাহিতে কয়েকগুণ পিছিয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে ৬ দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামায়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে যোগদান করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষার জন্যে ৬ দফা তুলে ধরেন। দফাগুলো হচ্ছে-
১. যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হবে। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠান।
২. কেন্দ্রীয় সরকাররের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যান্য সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
৩. সারা দেশে হয় অবাধে বিনিয়োগযোগ্য দু'ধরনের মুদ্রা, না হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একই ধরনের মুদ্রা করা যাবে।
৪. সকল প্রকার কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
৫. অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে, এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে।
৬. অঙ্গরাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধাসামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া। অতএব দেখা যাচ্ছে ৬ দফার বেশির ভাগ দফা ছিল অর্থনেতিক বৈষম্যকে কাটিয়ে তোলার জন্যে তাই বলা যেতে পারে “পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্যই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ছয় দফা দাবির আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল।”
