বাংলা ব্যাকরণ (এ টু জেট) পর্ব ১ | ব্যাকরণ কী? এর সংজ্ঞা উৎপত্তি ইতিহাস এবং পাঠের প্রয়োজনীয়তা

✒️ এই আর্টিকেল শেষে আমরা যা জানব
ব্যাকরণ কী? ব্যাকরণের সংজ্ঞা। বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস।  বাংলা ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা। ব্যাকরণের কাঠামো। ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাকরণের ভূমিকা।  সাহিত্যের সঙ্গে ব্যাকরণের সম্পর্ক।  সাহিত্যের ছাত্রদের ব্যাকরণ পাঠের অত্যাবশ্যকতা। ব্যাকরণের বিষয়বস্তু ইত্যাদি।



ব্যাকরণ কী?
‘ব্যাকরণ’ কথাটি একটি সংস্কৃত শব্দ। বুৎপত্তিগত অর্থে ‘ব্যাকরণ’ (বি + আ + √কৃ + অনট) হচ্ছে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। অর্থাৎ ব্যাকরণ মানে ভাষার স্বরূপ বিশ্লেষণ। ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করা এবং এদের সম্পর্ক নির্ণয়সহ প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচনা করাই ব্যাকরণের কাজ। ভাষার সাথে ব্যাকরণের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি ছাড়া অন্যটি কল্পনাও করা যায় না। যদিও ভাষা সৃষ্টির অনেক পরে ব্যাকরণের সৃষ্টি। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ব্যাকরণ বলতে ভাষার বিশ্লেষণ, প্রকৃতি ও প্রয়োগরীতি স্বরূপ আলোচনা ও ব্যাখ্যা করা বুঝিয়েছেন। এককথায় ব্যাকরণ হলো ভাষার সংবিধান। ব্যাকরণ ভাষাকে অনুসরণ করে। কিন্তু ভাষা ব্যাকরণকে অনুসরণ করে না। ভাবার বিশুদ্ধতার জন্য ব্যাকরণের সহায়তা অত্যাবশ্যক। ভাষার নিজস্ব গতি আছে। নিজস্ব গতিতে চলা অনেক ব্যাকরণের বিধি-বিধানকেও ছাড়িয়ে যায়। এ ব্যাপারটিও ব্যাকরণ এর নমনীয়তা দ্বারা আত্তীকরণ করে নেয়। এজন্য হয়ে থাকে ব্যাকরণ ভাষাকে শাসন করে না বরং ভাষাই ব্যাকরণকে শাসন করে।

ব্যাকরণের সংঙ্গা :
যে শাস্ত্র পাঠ করলে ভাষার প্রকৃতি ও স্বরূপ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা যায়, সেই সাথে ভাষা শুদ্ধরূপে বলতে, পড়তে ও লিখতে পারা যায় সে শাস্ত্রকে ব্যাকরণ বলে।
বর্তমান পৃথিবীতে আড়াই হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। প্রতিটি ভাষারই মূল উপাদান ধ্বনি, শব্দ ও বাক্য। ব্যাকরণ ধ্বনি কীভাবে উচ্চারিত হয়, ভাষা কীভাবে গঠিত ও রূপান্তরিত হয় এবং শব্দ কীভাবে বিন্যস্ত হয়ে বাক্য তৈরি করে- এ তিনটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করে। গ্রামার শব্দের সাথে ব্যাকরণের মিল রয়েছে। গ্রামার শব্দটি গ্রীক শব্দ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ শব্দ শাস্ত্র। ‘শুদ্ধ বর্ণ বিন্যাস বিদ্যা’ অর্থে কথাটির প্রাচীন প্রয়োগ ছিল। শব্দভিত্তিক আলোচনা বলে ব্যাকরণের সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাষাবিদ ব্যাকরণকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাদের কয়েকজনের সংজ্ঞা প্রামান্য সংজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করা হলো

* “যে শাস্ত্র দিয়ে কোনও ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ, প্রকৃতি ও প্রয়োগ রীতি বিশেষভাবে নির্ণয় করা যায় , তাকে ব্যাকরণ বলে।”
(”ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়“)

* "যে শাস্ত্রের দ্বারা ভাষাকে বিশ্লেষণ করে এর বিবিধ অংশের পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ণয় করা যায় এবং ভাষা রচনাকালে আবশ্যকতা সেই নির্ণীত তত্ত্ব ও তথ্য প্রয়োগ সম্ভবপর হয়ে ওঠে, তার নাম ব্যাকরণ।
(”ড. মুহম্মদ এনামুল হক”)

* “যে শাস্ত্রে কোন ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয় ও প্রয়োগবিধি বিশদভাবে আলোচিত হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে।
(”মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী”)

* “এখন ব্যাকরণ বা গ্রামার বলতে বোঝায় এক শ্রেণীর ভাষা বিশ্লেষাত্মক পুস্তক, যাতে সন্নিবিষ্ট হয় বিশেষ বিশেষ ভাষায় শুদ্ধ প্রয়োগের সূত্রাবলি।
(”ড. হুমায়ুন আজাদ”)

◾ব্যাকরণ টাঠের প্রয়োজনীয়তা
ভাষাকে শুদ্ধরূপে জানা ও ব্যবহার করার জন্য ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ একমাত্র ব্যাকরণই ভাষার চলার পথ সুনির্দিষ্ট করে দেয়। নিচে ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো

১. ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি : মনের ভাব প্রকাশের বেশ কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে। যেমন— ইশারা বা ইঙ্গিত, চিত্রাঙ্কন, অঙ্গ-ভঙ্গি, নাচ, কথা বলা তথা ভাষা। ভাষার মাধ্যমেই কেবল পূর্ণ মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। তবে ভাষার মাধ্যমে মনের ভাবকে সঠিকরূপে প্রকাশ করতে হলে ব্যাকরণ পাঠের কোনে বিকল্প নেই। কারণ, ব্যাকরণ ভাষার স্বরূপ বা প্রকৃতি বিচার-বিশ্লেষণ করে ভুলত্রুটি সংশোধন করে মনের ভাব কার্যকরভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করে।

২. সঠিক উচ্চারণ ও শুদ্ধ বানান নিশ্চিতকরণ : ভাষা লেখার জন্য যেমন বর্ণের প্রয়োজন তেমনি উচ্চারণের জন্য ধ্বনির প্রয়োজন। এই বর্ণ ও ধ্বনিগুলের সঠিক উচ্চারণ ও বানান ব্যাকরণের ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। বাংলা ভাষায় ‘ণ’ ‘ন’ ‘শ’ ‘ষ’ ‘স’-এর ব্যবহার রয়েছে। আরো ব্যবহার রয়েছে ‘উ’ ‘ঊ’ এবং যুক্তবর্ণের। এসব কিছুর উচ্চারণ পার্থক্য, বানান-বিধি ব্যাকরণ পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।

৩. শব্দের ব্যবহার, গঠন ও অর্থ নির্ণয় : শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শব্দের সঠিক অর্থ নিরূপণ এবং নতুন শব্দ গঠন করার ক্ষেত্রে রূপতত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক। শব্দ গঠনের উপায় হচ্ছে উপসর্গ, প্রত্যয়, সন্ধি ও সমাস। এগুলো সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকলে সামান্য মনের ভাব প্রকাশের জন্য বৃহৎ বাক্য ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তা শুতিমধুর হয় না। ব্যাকরণের সন্ধি, সমাস, প্রত্যয়, প্রকৃতির মাধ্যমে শব্দকে সংক্ষিপ্ত করা হয়। যেমন– “ সিংহ চিহ্নিত আসন” বলে বলা হয় ‘সিংহাসন’। ব্যাকরণ ছাড়া শব্দের এসব সংক্ষিপ্ত ও সাবলীলকরণের কথা কল্পনাও করা যায় না। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ব্যাকরণের দিক-নির্দেশনা অপরিহার্য।

৪. সুষ্ঠু বাক্য গঠন ও ভাব প্রকাশ : শুধু শব্দ নয়, বাক্য গঠন এবং বাক্যের অর্থ প্রকাশের ক্ষেত্রেও ব্যাকরণ পাঠের আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, ব্যাকরণ বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম নিয়ে কার্যকর আলোচনা করে। ব্যাকরণ পাঠ করে বাক্য, বাক্যের অংশ, বাক্যের প্রকার, বাক্য পরিবর্তন, পদক্রম, বাগধারা ও বাগ্‌বিধি, বাক্য বিশ্লেষণ, বাক্যরীতি, বাক্য সংকোচন, সংযোজন , বিয়োজন, ছেদ বা বিরাম চিহ্ন প্রভৃতি অবগত হয়ে ভাষাকে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর করা যায় |

৫. কবিতা লিখন, গানের ছন্দ ও অলঙ্করণ : মানুষের ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে বর্তমানে গদ্যকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। তবে গদ্য সাহিত্যের প্রধান শাখা নয়; বরং কবিতাই সাহিত্যের প্রধান শাখা। আর এই কবিতা ও গানের ছন্দ গঠন ব্যাকরণেরই বিষয় : ছন্দের শুদ্ধতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি কেবলমাত্র ব্যাকরণই নির্দেশ করে। এছাড়া ভাষার অলঙ্কার প্রয়োগেরও সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ব্যাকরণই এর প্রয়োগ ও পদ্ধতি নির্ণয় করে। অলঙ্কার প্রয়োগের ফলে ভাষা শ্রুতিমধুর ও সাবলীল হয়।

৬. সাহিত্যের মান উন্নয়ন : সাহিত্যের ছাত্রদের জন্য ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সাহিত্যের দোষ, গুণ, রীতি, অলঙ্কার ইত্যাদি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে হলে ব্যাকরণ পাঠ ছাড়া গত্যন্তর নেই।

ব্যাকরণের কাঠামো
বাক্যের মাধ্যমে মানুষের মনের ভাব পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ পায়। বাক্যকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় পদ। বাক্যে ব্যবহারের আগে প্রতিটি পদ শব্দ হিসেবে গণ্য হয়। শব্দকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় বর্ণ বা ধ্বনি। এভাবে মানুষের মনের ভাব প্রকাশক বাক্যের মধ্যে ব্যাকরণের কলা-কৌশল প্রতিভাত হয়ে উঠে। ব্যাকরণ ভাষার বিভিন্ন স্তরে বিন্যাস করে। ব্যাকরণের বিন্যাসকৃত স্তরের মধ্যে রয়েছে— ধ্বনি বা বর্ণ, শব্দ বা পদ এবং বাক্য। ধ্বনি ভাষার মূল ভিত্তি। ধ্বনির লিখিত রূপ বর্ণ, বর্ণ মিলে গঠিত হয় শব্দ। শব্দের সাথে বিভক্তি যুক্ত হয়ে গঠিত হয় পদ। কতকগুলো পদ মিলে বাক্যের সৃষ্টি। ভাষার এসব স্তরের মধ্যেই ব্যাকরণের কাঠামো নিহিত। ভাষাবিদগণ ব্যাকরণের কাঠামোকে ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দ তত্ত্ব বা রূপ তত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব এ তিনটি উপাদানের সমন্বয় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা ব্যাকরণের ধ্বনি বা বর্ণের আলোচনাকে ধ্বনি তত্ত্ব, শব্দ বা পদের আলোচনাকে শব্দ তত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব। আর বাক্যের আলোচনাকে বাক্যতত্ত্ব বলে চিহ্নিত করেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ব্যাকরণের কাঠামোর মধ্যে পাঁচটি বিভাগের কথা বলেছেন। বিভাগগুলো হলো- ধ্বনি প্রকরণ, শব্দ প্রকরণ,  বাক্য প্রকরণ, ছন্দ প্রকরণ ও অলঙ্কার প্রকরণ। 

ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারায় ব্যাকরণের একটি কাঠামোর কথা বলেছেন। তাঁর প্রদর্শিত কাঠামোর মধ্যে রয়েছে বর্ণ ও ধ্বনি (ধ্বনিতত্ত্ব), পদ, শব্দ (রূপতত্ত্ব) এবং বাক্য তত্ত্ব। তিনি তার কাঠামোর মধ্যে ছন্দ ও অলংঙ্কারকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

সুতরাং ব্যাকরণের অন্তর্ভুক্ত বিষয়াবলির প্রেক্ষিতে এর কাঠামো নিম্নরূপ :
১. ধ্বনিতত্ত্ব : বর্ণ প্রকরণ, বর্ণের উচ্চরণ, বর্ণ বিন্যাস, সন্ধি, ণত্ববিধান ও ষত্ববিধান ইত্যাদি ধ্বনি তত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

২. শব্দ তত্ত্ব : শব্দ গঠন, পদ পরিচয়, লিঙ্গ, বচন, শব্দ ও ধাতুরূপ, কারক, সমাস ইত্যাদি ব্যাকরণের শব্দ তত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।

৩. বাক্য তত্ত্ব : বাক্য গঠন, বাক্য বিশ্লেষণ, বাক্যের প্রয়েগ ইত্যাদি ব্যাকরণের বাক্য তত্ত্বের আলেচ্য বিষয়।

ব্যাকরণের শ্রেণীবিভাগ :
ভাষাবিদ ড. এনামুল হক-এর মতে, ব্যাকরণ তিন ধরনের। যথা :
১. ঐতিহাসিক, ২. তুলনামূলক ও ৩. ব্যবহারিক ব্যাকরণ। 
তবে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ব্যাকরণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যর প্রেক্ষিতে একে চার ভাগ করেছেন। যথাঃ ক. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ খ. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ গ. তুলনামূলক ব্যাকরণ এবং ঘ. দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণ। 

ক. বর্ণনাত্মক ব্যাকরণ : বিশেষ কোনো কালে বা সময়ে, কোনো একটি ভাষার রীতি ও প্রয়োগ ইত্যাদি বর্ণনা করা বর্ণনাত্মক ব্যাকরণের কাজ। সেই বিশেষ কালের ভাষা যথাযথ ব্যবহার করতে সাহায্য করা এর উদ্দেশ্য। এতে ভাষার ধ্বনি, শব্দ ও বাক্যের বিভিন্ন দিক যেমন ভাষার স্বরূপ ও প্রয়োগের কলা-কৌশল আলোচিত হয়।
খ. ঐতিহাসিক ব্যাকরণ : আধুনিক অথবা কোনো নির্দিষ্ট যুগের ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা করাই ঐতিহাসিক ব্যাকরণের কাজ।
গ. তুলনামূলক ব্যাকরণ : কোনো বিশেষ কালের একটি বিশেষ ভাষার গঠন, প্রয়োগ রীতি আলোচনা করা এবং অন্য ভাষায় প্রয়োগ রীতির সাথে তুলনা করাই তুলনামূলক ব্যাকরণের কাজ।
ঘ. দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণ : ভাষার অন্তর্নিহিত চিন্তনপ্রণালী আবিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট চিন্তন প্রমাণীয় অবলম্বন করে সাধারণভাবে কিংবা বিশেষভাবে ভাষার রূপের উৎপত্তি ও বিবর্তন প্রক্রিয়া বিচার-বিশ্লেষণ করা দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণের কাজ। সুতরাং বর্ণণামূলক বা সাধারণ ব্যাকরণ হচ্ছে ভাষা শিক্ষার কলা-কৌশল নিরূপণ ও শব্দানুশাসন; তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ব্যাকরণ হচ্ছে ভাষাবিজ্ঞান এবং দার্শনিক বিচারমূলক ব্যাকরণ হলো ভাষাবিষয়ক দর্শন।

◾ ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ব্যাকরণ

ভাষার সাথে ব্যাকরণের সম্পর্ক/ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার নামই ব্যাকরণ
ব্যাকরণের সৃষ্টি মূলত ভাষা আবিষ্কারের বহুকাল পরে। নিয়ত বিবর্তনশীলতা, পরিবর্তনশীলতা ভাষার বৈশিষ্ট্য। আর ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাষার সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ এবং ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এজন্য ভাষাবিজ্ঞানীরা ব্যাকরণকে ভাষার সংবিধান বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, সংবিধান অনুসারে দেশ পরিচালিত না হলে কিংবা দেশের সংবিধান না থাকলে যেমন দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়, তেমনি ভাষা ব্যাকরণ অনুসারে ব্যবহৃত না হলে কিংবা ব্যাকরণ না থাকলে এটি বিভিন্ন দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে। এতে করে ভাষার সংহতি, সৌন্দর্য ও মাধুর্যতা নষ্ট হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত প্রতিটি অভিজাত ভাষারই নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে। প্রতিটি ব্যাকরণেরই সংশ্লিষ্ট ভাষার স্বরূপ প্রকৃতি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ম-শৃঙ্খলা বর্ণিত থাকে। সুতরাং ভাষার সাথে ব্যাকরণের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আর এজন্যই বলা হয়ে থাকে, ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার নামই ব্যাকরণ।

সাহিত্যের সঙ্গে ব্যাকরণের সম্পর্ক
মানুষ সামাজিক জীব। বুদ্ধি-বিবেকের অধিকারী। বুদ্ধি বিবেকের তাড়নায় তাদের মধ্যে ভাবাবেগে সহরমানুভূতি সৃষ্টি হয়। এ ভাবাবেগ ও রমানুভূতি মানুষ শিল্প, সংগীত, নৃত্য চিত্রকলা, গাঁথা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ করে আসছিল। সাহিত্যের সৃষ্টিও তখন থেকেই। সাহিত্য সৃষ্টির মূলে রয়েছে মানুষের রসানুভূতিকে স্মরণীয় করে রাখার মানসিকতা। ব্যাকরণ ভাষার গঠন কৌশল ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাহিত্যেরও গঠন কৌশল ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে। তবে আপাত দৃষ্টিতে সাহিত্যের সাথে ব্যাকরণের সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত না হলেও ব্যাকরণ আয়ত্ত থাকলে সচেতনভাবে যেমন সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় তেমন সাহিত্য বুঝতেও সুবিধা হয়। সুতরাং এ কথা নিদ্বির্ধায় বলা যায় যে, সাহিত্যের রস আস্বাদনে ব্যাকরণের জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে ভাষাবিজ্ঞানীদের অভিমত হলে ব্যাকরণকে বাদ দিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি বা সাহিত্যের রস আস্বাদন প্রায় অসম্ভব।

সাহিত্যের ছাত্রদের ব্যাকরণ পাঠ অত্যাবশ্যক কিনা?
সাহিত্যের ছাত্রদের ব্যাকরণ পাঠ অত্যাবশ্যক কিনা তা আমরা বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ এনামুল হক এর একটি মন্তব্য থেকেই অনুধাবন করতে পারি। প্রসঙ্গ ক্রমে তিনি বলেছেন, আলো, জল, বিদ্যুৎ, বাতাস প্রভৃতি সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য না জানিয়াও মানুষ বাঁচিয়েছে, বাঁচিতেছে ও বাঁছিবে। কিন্তু তাই বলিয়া ঐ সমস্ত বস্তুর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যকে মানুষ অস্বীকার করিয়া বর্তমান সভ্যতায় গগনবিচুম্বী সৌধ নির্মাণ করিতে পারা যায় নাই। ব্যাকরণ না জানিয়াও ভাষা চিনতে পারে; কিন্তু ভাষাগত সভ্যতা না হোক, অন্তত সভ্যতার পত্তন বা সমৃদ্ধি হইতে পারে। ব্যাকরণ না জানিলে ভাষাগত আদর্শ হইতে বিচ্যুতি হইতে হয় বলিয়া ভাষা উন্নত প্রকৃতির ভাবের বাহন হইয়া শীতলতাসম্পন্ন সাহিত্যের সৃষ্টি করিতে পারে না। এই জন্যই শিক্ষিত ব্যক্তির পক্ষে ব্যাকরণ সম্বন্ধীয় সাধারণ জ্ঞানের সহিত সম্পর্ক বিশেষ আবশ্যক। ”এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সাহিত্যের ছাত্রদের ব্যকারণ পাঠ অত্যাবশ্যক।

বাংলা ব্যাকরণ

বাংলা ব্যাকরণ হচ্ছে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে শেখার সহায়ক শাস্ত্র। ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে বাংলা ব্যাকরণ অর্থ হচ্ছে বাংলা ভাষার বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। এতে বাংলা শব্দের বুৎপত্তি, প্রয়োগ ইত্যাদি আলোচনা স্থান পায়। সুতরাং যে শাস্ত্র পাঠ করলে বাংলা ভাষার প্রকৃতি ও স্বরূপ সহজভাবে বিশ্লেষণ করা যায় এবং যে শাস্ত্র ভাষা শুদ্ধরূপে শিখতে সাহায্য করে ও এর প্রয়োগরীতি আলোচনা করে, সে শাস্ত্রকে ব্যাকরণ বলে।
প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন ভাষাবিদ বিভিন্নভাবে বাংলা ব্যাকরণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাদের কয়েকজনের সংজ্ঞা প্রামাণ্য সংজ্ঞা হিসেবে উপস্থাপন করা হলে--
ড. শহীদুল্লাহর মতে, যে শাস্ত্ৰ জানলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায়, তার নাম বাংলা ব্যাকরণ।
ড. সুকুমার সেনের মতে, যে শাস্ত্রে বাংলা ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতির বিচার-বিশ্লেষণে আছে এবং যে শাস্ত্রে জ্ঞান থাকলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে বলতে, লিখতে ও শিখতে পারা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।

বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস

কৃষ্ণযজুর্বেদ’ থেকে ব্যারকন শব্দটির উৎপত্তি। এতে দেবরাজ ইন্দ্রকে অন্যান্য দেবতারা ভাষাকে ব্যাকৃত করতে অনুরোধ করেছেন। অর্থাৎ ঐ ভাষার ব্যাকরণ নির্দেশ করতে বলেছেন। ভাষাবিজ্ঞানের অঙ্গ চারটি বেদাঙ্গের মধ্যকার শিক্ষা, নিরুক্ত, ব্যাকরণ ও ছন্দ। 

সুপ্রাচীনকালে ভারতীয় উপমহাদেশে সংস্কৃত ভাষার শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ব্যাকরণের উৎপত্তি হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে থাস্ক, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে পানিনি, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে কাত্যায়ন খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে পতঞ্জলি প্রমুখ পণ্ডিতগণ সংস্কৃত ব্যাকরণ চর্চায় বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ব্যাকরণ শাস্ত্রে পানিনি, কাত্যায়ন ও পতঞ্জলি ত্রিমুনি নামে পরিচিত। ভট্টোজি দীক্ষিতের ‘সিদ্ধান্ত কৌমুদী’ সপ্তদশ শতাব্দীতে পানিনি চর্চায় সবিশেষ ভূমিকা পালন করে। সে সময় পানিনি-ধারা ছাড়াও ঐদ্র, চান্দ্র, সৌপদ্ম, মুগ্ধবোধ, জৌমর, কাপালিক, সায়াত প্রভৃতি ব্যাকণের ধারা প্রচলিত ছিল। ব্যাকরণ চর্চার এ সুবর্ণযুগেও বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ তথা ভাষা শৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় নি। কেননা বাংলা ভাষা তখন জন্ম-প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতের মধ্যেই লুক্কায়িত ছিল।

বাংলা ব্যাকরণ রচনার প্রয়াস শুরু হয় মূলত আঠার শতকের ত্রিশ দশকে। আর তা ছিল বিদেশিদের দ্বারা পণ্ডিত বাংলা ব্যাকরণ রচনার প্রয়াস। এভাবেই আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুচ্ছের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বাংলা ভাষায় বিশ্লেষণ শাস্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে আড়াই শ’ বছর ধরে ভাষাবিজ্ঞানী ও ব্যাকরণবিদগণ বাংলা ভাষায় বৈচিত্র্যপূর্ণ শৃঙ্খলাবিধি বিশ্লেষণ করেছেন। একের পর এক তারা সংকলন করেছেন অভিধান, রচনা করেছেন ব্যাকরণ, আবিষ্কার করেছেন বাংলা ভাষার যুগোত্তীর্ণ ধারা। মানোএল দা আসসুস্পগাঁট, নামক একজন পুর্তগিজ প্রাদ্রি সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। যা ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। যা ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পুর্তগালের রাজধানী লিসবন থেকে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির নাম ছিল 'Vocabulario Em Indioma Bengalla, Portuguez' উক্ত ব্যাকরণটি পরবর্তীকালে অসংখ্য ভাষাবিদের প্রতিভার সংস্পর্শে সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে বাংলা ভাষায় প্রথম সম্পূর্ণ ব্যাকরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রামি হ্যালহেড রচিত "A Grammar of the Bengali language." তাকে লেখক ‘বোধ প্রকাশং শব্দশাস্ত্রং’ অভিধায় অভিষিক্ত করেন। ব্রাসি হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণ রচনার উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজদের সহজে বাংলা ভাষা আয়ত্ত করা। এরপর উইলিয়াম কেরী, রাজা রামমোহন রায়, রামকমল বিদ্যালঙ্কার, শ্যামাচরণ শর্মা, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, হরনাথ ঘোষ, ড. মুহম্মদ এনামূল হক, মুহম্মদ আব্দুল হাই এবং আরো অনেকে বাল্লা ব্যাকরণ বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

১৮২৬ সালে রাজা রামমোহন রায় বাঙালিদের মধ্যে সর্বপ্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ইংরেজি ভাষায় রচিত। এরপর তাঁর রচিত গৌড়ীয় ব্যাকরণই বাঙালি কর্তৃক লিখিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ। এটি ১৮৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অনেক বাঙালি পণ্ডিত ব্যাকরণ রচনায় মনোনিবেশ করেন। তবে এগুলো ছিল ইংরেজি ও সংস্কৃত ব্যাকরণের আদর্শে প্রণীত। কালক্রমে অনেক বাংলা ভাষাভাষী মনীষী আধুনিক ও মৌলিক চিন্তাধারায় বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহম্মদ এনামূল হক ও ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য পানিনি থেকে বিদ্যাসাগর পর্যন্ত সংস্কৃত ব্যাকরণের ধারাটি দু’হাজারেরও বেশি বছর এবং মনোএল দা আসসুম্পসাঁউ থেকে সুনীতি কুমার পর্যন্ত ধারাটি আড়াই শ’ বছরের। এ ধারা দুটির দ্বিতীয়টি প্রথমটির কাছে অপরিশোধ্য ঋণে ঋণী । একথা সত্য যে, বাংলা ভাষা হাজার বছরের পুরনো। তবে এর স্বরূপও প্রকৃতি বিশ্লেষিত হয়ে আসছে মাত্র আড়াইশ বছর ধরে।

বিশ শতকের শুরুতেও বাংলা ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনার প্রয়াস ছিল। শ্রীনাথ সেনের ‘ভাষাতত্ত্ব, গ্রন্থটি এসময়কার বালা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণ রচনর প্রথম নিদর্শন। যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধির ‘বাঙ্গালা ভাষা’ গ্রন্থটিও এসময়কার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বিজয় চন্দ্র মজুমদারের  ’The History of the Bengali Language' বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক ব্যাকরণের পরিচায়ক। যা ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয়।

◾ব্যাকরণের বিষয়বস্তু

প্রত্যেক ভাষারই তিনটি মৌলিক অংশ থাকে।
১. ধ্বনি (Sound), ২. শব্দ (Word), ও ৩. বাক্য (Sentence)
এক একটি অংশকে অবলম্বন করে ব্যাকরণের এক একটি শাখা গঠিত হয়েছে। এ কারণে সব ভাষার ব্যাকরণেই প্রধানত তিনটি বিষয়ের আলোচনা করা হয়।
১. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonetics), ২. শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব (Morphology) ও ৩. বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax)।
এছাড়া ছন্দ এবং অলঙ্কারকেও ব্যাকরণের আনুষঙ্গিক বিষয় বলে মনে করা হয়। ভাষা মানুষের জীবনাচরণের অপরিহার্য উপায়। সময়ের ঘূর্ণিপাকে মানবজীবনের গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন ঘটে। ফলে ভাষার সংগঠনেরও পরিবর্তন আসে, কেননা ভাষা মানুষের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়, ভাষার প্রয়োজনে মানুষ নয়, তাই ভাষাও পরিবর্তনশীল। ভাষা কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না এবং কখনে নির্দিষ্ট রূপে আবদ্ধ থাকে না। প্রতিনিয়তই এতে নতুন নতুন মাত্রা এবং বৈশিষ্ট্য যোগ হয়। এ কারণে ব্যাকরণের বিষয়বস্তুর পরিবর্তন এবং বিবর্তন ঘটে। যেহেতু ব্যাকরণ মানবজীবন সাপেক্ষ, তাই ব্যাকরণ মানব জীবনাচরণকে অনুসরণ করে চলে। ফলে কখনো কখনো ব্যাকরণের বিভিন্ন নিয়ম-কানুনের পরিবর্তন ঘটে। তাই ব্যাকরণের পরিপূর্ণ বিষয়বস্তুর তালিকায় অর্থতত্ত্ব (Semantics), অভিধানতত্ত্ব (Dexicography), উপভাষাতত্ত্ব, পরিভাষা, ভাষার গতিবিধি, ভাষার সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। ব্যাকরণের উচ্চতম পর্যায় ভাষাতত্ত্বে এসব বিষয় আলোচিত হয়।

১. ধ্বনিতত্ত্ব :
ধ্বনি : মানুষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে সৃষ্ট আওয়াজকে ধ্বনি বলে। 
বাগ্‌যন্ত্র দ্বারা উৎপন্ন ধ্বনির সূক্ষ্মতম মৌলিক অংশকে ধ্বনি একক (Sound unit) বলে। ধ্বনির নিজস্ব কোনো অর্থ নেই। কিন্তু ধ্বনির পর ধ্বনি সাজিয়ে কোনো বস্তু বা অনুভূতিকে সাংকেতিকভাবে বোঝানো হয়। এভাবে নিরর্থক ধ্বনি অর্থবোধকতা অর্জন করে।
বর্ণ : ধ্বনির লিখিত রূপই হচ্ছে বর্ণ। অর্থাৎ, যে প্রতীক বা চিহ্ন ব্যবহার করে ধ্বনিকে প্রকাশ করা হয় তাকে বর্ণ বলে। এক্ষেত্রে কোন একটি বিশেষ ধ্বনি একই ভাষাভাষী মানুষের কাছে অভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন হিসেবে প্রত্যক্ষ হয়। যেমন— অ, ক , A , B ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন ধ্বনির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশযোগ্য চিহ্ন।
ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়
(ক) ধ্বনির স্বরূপ (খ) ধ্বনির প্রকারভেদ (গ) ধ্বনির উচ্চারণ প্রণালী
(ঘ) ধ্বনির উচ্চারণ স্থান (ঙ) ধ্বনির প্রতীক বা বর্ণের বিন্যাস (চ) ধ্বনি সংযোগ বা সন্ধি
(ছ) ধ্বনি পরিবর্তন ও লোপ এবং (জ) ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান

◾২. রূপতত্ত্ব : এক বা একাধিক অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে গঠিত হয় শব্দ (Word)। অর্থবোধক ধ্বনি সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে মনের ভাব ব্যক্ত করলে তা বাক্যের রূপ পায়। ধ্বনি যেমন শব্দের ক্ষুদ্রতম অংশ, তেমনি শব্দই হচ্ছে বাক্যের ক্ষুদ্রতম একক। শব্দ বিচ্ছিন্নভাবে বা এককভাবে উচ্চারিত হলে তাকে শব্দ বলা হলেও, ঐ একই শব্দ যখন কোনে বাক্যে ব্যবহৃত হয় বা অন্যভাবে বলে, যে শব্দ যখন বিভক্তিসহ ব্যবহৃত হয়,  তখন তাকে পদ বলে। প্রত্যেকটি পদই এক একটি শব্দ কিন্তু প্রত্যেকটি শব্দই পদ নয়,  অর্থাৎ শব্দ যতক্ষণ না বাক্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, ততক্ষণ তাকে পদ বলা যাবে না। রূপতত্ত্বে এ শব্দ দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়—
১. এক বা একাধিক ধ্বনির সমন্বয় হিসেবে এবং ২. একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যের গাঠনিক উপাদান হিসেবে।

রূপতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়
  1.  সাধারণ শব্দ বা শব্দের স্বরূপ;
  2. শব্দের ব্যুৎপত্তি ;
  3. ক্রিয়ামূল বা ধাতু রূপ;
  4. শব্দের গঠন ও পরিবর্তন ;
  5. বচন ও লিঙ্গ এবং
  6. ক্রিয়ার কাল ও পুরুষ।
৩. বাক্যতত্ত্ব
কতকগুলো অর্থবেধক শব্দ সুশৃঙ্খলভাবে পাশাপাশি বসে যদি মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করে, তাহলে তাকে বাক্য বলা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় দু’ বা ততোধিক পদ মিলিত হয়ে যখন একটি সম্পূর্ণ মনের ভাব প্রকাশ করে, তখন তাকে বাক্য বলে।

বাক্যতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়ঃ
  1. বাক্যের গঠন-প্রনালী;
  2. পদের রূপ পরিবর্তন ;
  3. বাক্যের মধ্যে বিভিন্ন শব্দের পারস্পরিক সম্বন্ধ;
  4. বিভিন্ন উপাদানের সংযোজন ও বিয়োজন;
  5. বাক্যের মধ্যে শব্দের বা পদের স্থান ও ক্রম এবং
  6. বাক্যের মধ্যে শব্দের সার্থক ব্যবহার যোগ্যতা।

Maruf Ahmed (মারুফ আহমেদ)

আমি একজন ব্লগার এবং স্টুডেন্ট। লেখালেখি এবং টেকনোলজির প্রতি অসামান্য আগ্রহ থেকেই আমার হাত ধরে bologar.com এর সূচনা। নতুন কিছু জানতে এবং জানাতে পারলে আমি আনন্দ পাই। যেকোন বয়সের পাঠক এখানে সাদরে আমন্ত্রিত।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post