বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে রাজনৈতিক ঘঘনাপ্রবাহের একটি তালিকা

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে রাজনৈতিক ঘটনারপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস



১. বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে ভাষা আন্দোলন: পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই এই রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করলে বাঙালিদের নেতা শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এর বিরোধিতা করেন। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখনই বিতর্কটি পুনরায় শুরু হয়। এভাবে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বহু প্রাণের, সংগ্রামের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমাদের এই বাংলা ভাষা। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনারে খালি পায়ে হেঁটে ফুল অর্পণ করে আমরা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বাঙালি জাতির কাছে দিনটি একটি শোকের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার দিন। কানাডা প্রবাসী কয়েকজন বাঙালির উদ্যোগ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের কটনৈতিক তৎপরতার ফলে ১৯৯৯ সালে ১৭ ই নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা,  বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো বাংলাদেশের ২১ শে ফেব্রুয়ারির শহিদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে ।

২. আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন: মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতাত্তিক ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল উদ্যোগ ছিল আওয়ামী লীগের। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে দলের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ জাতীয়তাবাদের ধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এই সময়ে দলটি পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সকল স্বার্থ রক্ষায় এক দিকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখে, অন্যদিকে সংসদ ও প্রাদেশিক সরকারের সদস্যগণ সর্বত্র সোচ্চার হতে থাকেন। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটানোর লক্ষে ১৯৫৩ সালের ১৪ ই নভেম্বর আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২১ দফা প্রণয়ন শেষে ৪ টি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় দল ৪ টি হলো, আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল।

৩. সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬১ সালেই পূর্ব বাংলায় আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসে বাঙালিদের প্রিয় নেতা ও পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তার করা হলে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হলে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৬২ সালে আইয়ুবের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। ঐ সময় ছাত্র সমাজ ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। শিক্ষানীতি বিষয়ক আন্দোলনে বিভিন্ন পেশাজীবীরাও অংশগ্রহণ করে। এই সঙ্গে সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠিত হয়। এই সংগঠন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে।

৪. ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ১৯৬৬ সালের ৫-৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলনে যোগদান করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষার জন্যে ৬ দফা তুলে ধরেন। ফাগুলো হচ্ছে__

ক. যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হবে। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠান।

খ. কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যান্য সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

গ. সারা দেশে হয় অবাধে বিনিয়োগযোগ্য দু'ধরনের মুদ্রা, না হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একই ধরনের মুদ্রা করা যাবে
ঘ. সকল প্রকার কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে । আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

ঙ. অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে, এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে।

চ. অঙ্গ রাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধাসামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া।

৫. ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান: গণঅভ্যুত্থান বেগবান হয় ছয় দফার সাথে যখন ছাত্রদের এগারো দফা যোগ হয়। এই আন্দোলন বাঙালির সংগ্রামী চেতনাকে শাণিত করে। বাঙালিকে সাহসী জাতিতে রূপান্তরিত করে। এর সূত্র ধরেই পূর্ব বাংলার উপর পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের অবসান হয়।

৬. ১৯৭০ সালের নির্বাচন: ১৯৭০ সালের ৭ ই ডিসেম্বর সর্বপ্রথম এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ,  ন্যাপ (ওয়ালী), মুসলিম লীগ (কাইয়ুম), মুসলিম লীগ (কনভেনশন), পাকিস্তান পিপলস পার্টি, ডেমেক্রেটিক পার্টি, জামাত-ই-ইসলামি প্রভৃতি দল অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ ৬ দফার পক্ষে নির্বাচনকে চলভোট হিসেবে অভিহিত করে। নির্বাচনে ৫ কোটি ৬৪ লাখ ভোটারের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ৩ কোটি ২২ লাখ। ১৯৭০ সালের ৭ ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের (এবং কিছু আসনে ১৭ ই জানুয়ারি, ১৯৭১) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য তিটি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন (৭ টি মহিলা আসনসহ) করে ১৭ ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ১০০ টির মধ্যে ২৮৮ টি আসন আওয়ামী লীগ পায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিয়ে ছিল নজিরবিহীন। এর ফলশ্রুতিতেই আওয়ামী লীগ করে সরকার গঠন ও দফার পক্ষে গণরায় লাভ করতে সমর্থ হয়।

Maruf Ahmed (মারুফ আহমেদ)

আমি একজন ব্লগার এবং স্টুডেন্ট। লেখালেখি এবং টেকনোলজির প্রতি অসামান্য আগ্রহ থেকেই আমার হাত ধরে bologar.com এর সূচনা। নতুন কিছু জানতে এবং জানাতে পারলে আমি আনন্দ পাই। যেকোন বয়সের পাঠক এখানে সাদরে আমন্ত্রিত।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post